জানাজার নামাজের নিয়ম : প্রতিটি মুসলমানের জানা জরুরি
📌এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন🔥
জানাজার নামাজের নিয়ম: মুসলিম সমাজে মৃত্যু শুধু একটি পারিবারিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সামষ্টিক দায়িত্বের সূচনা। যখন কোনো মুসলমান ইন্তেকাল করেন, তখন তার গোসল, কাফন, জানাজা, দাফন এই প্রতিটি ধাপ ইসলামের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নির্ধারিত। জানাজার নামাজ সেই দায়িত্ব গুলোর অন্যতম, যা শুধু ইবাদত নয় বরং মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা ও রহমত কামনার এক অনন্য মাধ্যম।
জানাজার নামাজের নিয়ম জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি। কারণ এটি ফরজে কিফায়া অর্থাৎ সমাজের কেউ আদায় করলে দায়িত্ব উঠে যায়, কিন্তু কেউ না করলে সবাই গুনাহগার হয়। তাই জানাজার নামাজ কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একজন মুসলমানের মৌলিক দায়িত্বের অংশ।
ইসলামে জানাজার গুরুত্ব ও হাদিসের নির্দেশনা
ইসলাম মৃত ব্যক্তির সম্মান ও অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। দাফন-কাফন এবং জানাজার নামাজ একজন মুসলমানের ন্যায্য অধিকার। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানের ওপর মুসলমানের যে ছয়টি অধিকার রয়েছে, তার একটি হলো মৃত্যুর পর জানাজায় শরিক হওয়া। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, জানাজার নামাজ শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ঈমানি কর্তব্য।
এই নামাজের মাধ্যমে জীবিতরা মৃতের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করে, তার গুনাহ মাফের আবেদন জানায় এবং পরকালের সফরকে সহজ করার কামনা করে। এ কারণেই জানাজার নামাজের নিয়ম সঠিক ভাবে জানা ও আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জানাজার নামাজের কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য
জানাজার নামাজ অন্যান্য ফরজ নামাজের মতো নয়। এতে কোনো রুকু, সিজদা বা কায়দা নেই। সম্পূর্ণ নামাজটি দাঁড়িয়ে চারটি তাকবিরের মাধ্যমে আদায় করা হয়। ঈদের নামাজের মতো তাকবিরের সময় বারবার হাত তোলার প্রয়োজন নেই। কেবল প্রথম তাকবিরে হাত তুলে নামাজ শুরু করতে হয়, এরপর হাত বাঁধা অবস্থায় বাকি দোয়া ও দরুদ পাঠ করা হয়।
জানাজার নামাজের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর কাঠামো মূলত মৃতের জন্য দোয়া কেন্দ্রিক, যেখানে আল্লাহর প্রশংসা, রাসুল (সা.)-এর ওপর দরুদ এবং মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত কামনা করা হয়।
জানাজার নামাজের নিয়ত ও নিয়তের গুরুত্ব
জানাজার নামাজের নিয়ম অনুযায়ী নিয়ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা ফরজ নয়, তবে অন্তরে স্পষ্ট নিয়ত থাকা আবশ্যক। আরবিতে নিয়ত করতে পারলে ভালো, তবে বাংলায় নিয়ত করলেও নামাজ সহিহ হয়।
আরবিতে জানাজার নামাজের নিয়ত হলো
نَوَيْتُ اَنْ اُؤَدِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ تَكْبِيْرَاتِ صَلَوةِ الْجَنَا زَةِ فَرْضَ الْكِفَايَةِ وَالثَّنَا ءُ لِلَّهِ تَعَا لَى وَالصَّلَوةُ
عَلَى النَّبِىِّ وَالدُّعَا ءُلِهَذَا الْمَيِّتِ اِقْتِدَتُ بِهَذَا الاِْمَامِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ
এখানে মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে “لِهَذَا الْمَيِّتِ” এবং নারী হলে “لِهَذِهِ الْمَيِّتِ” ব্যবহার করতে হয়। এই সূক্ষ্ম বিষয়টি জানাজার নামাজের নিয়মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলায় নিয়ত করলে মনে মনে এভাবে নিয়ত করা যায় আমি চার তাকবিরের সঙ্গে ফরজে কিফায়া জানাজার নামাজ কিবলামুখী হয়ে ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়ার উদ্দেশ্যে আদায় করছি।
প্রথম তাকবির ও সানা পাঠ
নিয়তের পর প্রথম তাকবির অর্থাৎ তাকবিরে তাহরিমা বলে হাত তুলতে হয় এবং তারপর হাত বেঁধে সানা পাঠ করতে হয়। জানাজার নামাজে সানার ভাষা সাধারণ নামাজের সানার মতোই।
আরবিতে সানা:
سُبْحَا نَكَ اَللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَا لَى جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاءُكَ وَلاَ اِلَهَ غَيْرُكَ
এই সানার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করা হয়, যা জানাজার নামাজের সূচনাকে গভীর অর্থবহ করে তোলে।
দ্বিতীয় তাকবির ও দরুদ শরীফ
সানা পাঠ শেষ হলে দ্বিতীয় তাকবির বলতে হয়। এই তাকবিরের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ শরীফ পাঠ করা হয়। সাধারণ নামাজে তাশাহুদের পর যে দরুদ পড়া হয়, জানাজার নামাজেও ঠিক সেটিই পড়া হয়।
দরুদ শরীফ
للَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَ اهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌ
مَّجِيْدٌ- اَللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَا هِيْمَ اِنَّكَ
حَمِيْدٌمَّجِيْدٌ
এই দরুদ জানাজার নামাজের নিয়মের এমন একটি অংশ, যা মৃত ও জীবিত উভয়ের জন্য বরকতের মাধ্যম।
তৃতীয় তাকবির ও জানাজার দোয়া
তৃতীয় তাকবিরের পর জানাজার মূল দোয়া পাঠ করা হয়। এটি জানাজার নামাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত কামনা করা হয়।
জানাজার দোয়া
اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِ نَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَاُنْثَنَا اَللّٰهُمَّ مَنْ اَحْيَيْتَهُ مِنَّا
فَاَحْيِهِ عَلٰى الْاِسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلٰى الْاِيْمَانِ
এই দোয়ায় জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত সব মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করা হয়েছে, যা জানাজার নামাজকে একটি সামষ্টিক ইবাদতে পরিণত করে।
শিশুদের জানাজার জন্য বিশেষ দোয়া
নাবালক ছেলে ও মেয়ের জানাজার নামাজে দোয়া ভিন্ন হয়। কারণ শিশুদের কোনো গুনাহ নেই, তাই তাদের জানাজায় দোয়ার ভাষাও ভিন্নভাবে নির্ধারিত।
নাবালক ছেলের জানাজার দোয়া
اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرْطًا وْاَجْعَلْهُ لَنَا اَجْرًا وَذُخْرًا وَاجْعَلْهُ لَنَا شَافِعًا وَمُشَفَّعًا
নাবালিকা মেয়ের জানাজার দোয়া
اللَّهُمَّ اجْعَلْهَا لَنَا فَرْطًا وَاجْعَلْهَا لَنَا اَجْرًا وَذُخْرًاوَاجْعَلْهَا لَنَا شَافِعَةً وَمُشَفَّعَة
এই দোয়া গুলো জানাজার নামাজের নিয়মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা শিশুদের মর্যাদা ও রহমতের প্রতিফলন।
চতুর্থ তাকবির ও সালাম
তৃতীয় তাকবিরের দোয়া শেষ হলে চতুর্থ তাকবির দিতে হয়। এরপর অল্প সময় নীরব থেকে ডানে ও বামে সালাম ফিরিয়ে জানাজার নামাজ শেষ করা হয়। সালামের মাধ্যমেই এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ নামাজের সমাপ্তি ঘটে।
দেরিতে জানাজায় পৌঁছালে করণীয়
কেউ যদি জানাজার নামাজে দেরিতে পৌঁছে যায়, তাহলে তাকে ইমামকে অনুসরণ করতে হয়। সম্ভব হলে বাকি তাকবিরগুলো আদায় করে নেওয়া উচিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে ইমামের সঙ্গে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করলেও জানাজার নামাজ আদায় হয়ে যায়। যেহেতু জানাজার নামাজ জামাতে আদায় করতে হয়, তাই এর কাজা পড়ার সুযোগ নেই।
শেষকথা
জানাজার নামাজের নিয়ম জানা মানে শুধু একটি ইবাদত শেখা নয়, বরং মুসলিম সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব বোঝা। মৃত্যু আমাদের সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয় একদিন আমাদেরও এই জানাজার প্রয়োজন হবে। তাই জীবিত অবস্থায় জানাজার নামাজের নিয়ম শিখে রাখা এবং তা যথাযথভাবে আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। এই ইবাদতের মাধ্যমে আমরা মৃতের জন্য দোয়া করি, আর নিজের জন্যও আখিরাতের প্রস্তুতি নিই।
ডিসক্লাইমার: এই কনটেন্টটি শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। মাজহাবভেদে কিছু বিষয়ে ভিন্নতা থাকতে পারে; তাই নির্ভরযোগ্য আলেম ও প্রামাণ্য ইসলামি সূত্র অনুসরণ করা শ্রেয়।
