আইটি বিতান এ আমরা চেষ্টা করি সহজ বাংলা ভাষায় আপনাদের কাছে প্রযুক্তির নতুন খবর ও দরকারি টিউটোরিয়াল তুলে ধরতে, যাতে সবাই সহজে বুঝতে পারে। স্মার্টফোন, অনলাইন ইনকাম কিংবা ডিজিটাল দুনিয়ার খুঁটিনাটি সব তথ্য জানতে আমাদের সাথেই থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামে  যুক্ত হোন।

বিদ্রোহী কবিতা |কাজী নজরুল ইসলাম

📌এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন🔥

বিদ্রোহী কবিতা: প্রিয় পাঠক, আজ আপনার সামনে যে কবিতাটি তুলে ধরেছি, সেটি কোনো সাধারণ কবিতা নয় এটি বাংলা সাহিত্যের এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতা এমন এক সৃষ্টি, যা পড়লে কেবল চোখ নয়, জেগে ওঠে মনের গভীর সাহস। এই কবিতায় কবি নিজের কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদা আর মুক্ত মানুষের ডাক।

যখন সমাজ অন্যায়, শোষণ আর ভয়কে স্বাভাবিক করে তোলে ঠিক তখনই বিদ্রোহী কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাথা নত করার জন্য মানুষ জন্মায়নি। এই কবিতার প্রতিটি পংক্তি যেন পাঠকের বুকের ভেতর প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আমরা কি সত্যিই মুক্ত? নাকি কেবল অভ্যস্ত হয়ে গেছি শৃঙ্খলের সাথে?

এই কবিতা পড়ার সময় শুধু পড়বেন না, অনুভব করার চেষ্টা করুন। কারণ বিদ্রোহী কবিতা কেবল শব্দ নয় এটি এক ধরনের চেতনা। নিচে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতাটি শেয়ার করা হলো:

বিদ্রোহী কবিতা

বিদ্রোহী

– কাজী নজরুল ইসলাম


বল বীর –

                  বল উন্নত মম শির!

শির       নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!

                                          বল বীর –

বল        মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’

             চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’

             ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,

             খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া

             উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!

মম        ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!

                                          বল বীর –

             আমি           চির-উন্নত শির!


             আমি চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,

মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,

             আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!

আমি দুর্ব্বার,

             আমি ভেঙে করি সব চুরমার!

             আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,

আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল!

             আমি মানি নাকো কোনো আইন,

আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম, ভাসমান মাইন!

             আমি ধূর্জ্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!

             আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!

                                          বল বীর –

             চির-        উন্নত মম শির!


       আমি     ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,

আমি     পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্নি!

আমি     নৃত্য-পাগল ছন্দ,

আমি     আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।

আমি     হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,

আমি     চল-চঞ্চল, ঠুমকি’ ছমকি’

             পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’

             ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!

             আমি চপলা-চপল হিন্দোল!

আমি     তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,

করি       শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,

             আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!

আমি     মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর।

আমি     শাসন-ত্রাসন, সংহার, আমি উষ্ণ চির-অধীর।

                                             বল বীর –

              আমি     চির-উন্নত শির!


        আমি     চির-দুরন্ত-দুর্ম্মদ,

আমি     দুর্দ্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দ্দম্ হ্যায়্ হর্দ্দম্ ভরপুর মদ।

             আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,

             আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!

আমি     সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,

             আমি অবসান, নিশাবসান।

             আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য্য,

মম       এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য্য।

আমি     কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।

আমি     ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।

                                           বল বীর –

             চির-              উন্নত মম শির।


             আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক

আমি     যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক!

             আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,

আমি     আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!

             আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,

আমি     ইস্ত্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,

আমি     পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্ম্মরাজের দন্ড,

আমি     চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ-প্রচন্ড!

আমি     ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,

আমি     দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!

             আমি প্রাণ-খোলা হাসিউল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,

             আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!

আমি     কভু প্রশান্ত, – কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,

আমি     অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!

আমি     প্রভঞ্জনের উচ্ছাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,

             আমি উজ্জ্বল আমি প্রোজ্জ্বল,

আমি     উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল্-দোল!-


আমি     বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,

আমি     ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি।

             আমি উন্মন মন উদাসীর,

আমি     বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর!

আমি     বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,

আমি     অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!

আমি     অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,

চিত-     চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!

             আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল ক’রে দেখা অনুখন,

             আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্।

             আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,

             আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর!

             আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া,

             আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীনে গান গাওয়া!

             আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র রবি,

             আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি! –

             আমি         তুরিয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!

আমি     সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!


আমি     উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,

আমি     বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব বিজয় কেতন!

             ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া

                                     স্বর্গ-মর্ত্ত্য করতলে,

তাজি     বোরবাক্ আর উচ্চৈস্রবা বাহন আমার

                                               হিম্মত-হ্রেস্বা হেঁকে চলে!

আমি     বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,

আমি     পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথর-কলরোল-কল-কোলাহল!

আমি     তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া, দিয়া লম্ফ,

আণি     ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা, সঞ্চরি’ ভূমি-কম্প!

             ধরি বাসুকির ফনা জাপটি’, –

ধরি       স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’!

             আমি দেব-শিশু, আমি চঞ্চল,

আমি     ধৃষ্ট আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল!


             আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,

             মহা- সিন্ধু উতলা ঘুম্-ঘুম্

ঘুম্        চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্

             মম     বাঁশরী তানে পাশরি’

             আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।

             আমি       রুষে উঠে’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,

ভয়ে       সপ্ত নরক হারিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!

আমি     বিদ্রোহী-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!


             আমি আমি শ্রাবণ প্লাবন- বন্যা,

কভু       ধরণীরে করি বরণিয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা –

আমি     ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!

আমি     অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,

আমি     ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি!

আমি     ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,

আমি     জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!


             আমি মৃণ্ময়, আমি চিন্ময়,

             আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়!

             আমি মানব দানব দেবতার ভয়,

             বিশ্বের আমি চির দুর্জ্জয়,

             জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,

আমি     তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত্ত্য

                     আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!

আমি     চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!



              আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,

              নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!

                                                       আমি হল বলরাম-স্কন্ধে,

আমি     উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।


                          মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত

                   আমি সেই দিন হব শান্ত,

যবে       উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,

             অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –

                       বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত

                       আমি সেই দিন হব শান্ত!

আমি     বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,

আমি     স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!

আমি     বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!

             আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!


             আমি চির-বিদ্রোহী বীর –

             আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

শেষকথা

প্রিয় পাঠক, বিদ্রোহী কবিতা পড়া শেষ হলেও আসলে এর কোনো শেষ নেই। কারণ এই কবিতা শব্দে থেমে যায় না এটি থেকে যায় মানুষের ভেতরে। যখনই অন্যায় দেখেও চুপ করে থাকতে ইচ্ছে করে, যখনই ভয় মাথা চেপে ধরে ঠিক তখনই এই কবিতা মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কখনো নত হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।

কাজী নজরুল ইসলাম এখানে শুধু নিজের বিদ্রোহের কথা বলেননি, তিনি আমাদের প্রত্যেকের ভেতরের চাপা পড়ে থাকা কণ্ঠকে জাগিয়ে তুলেছেন। এই কবিতা আমাদের শেখায় বিদ্রোহ মানে ভাঙচুর নয়, বিদ্রোহ মানে অন্যায়ের সামনে না বলার শক্তি।

আপনি যদি এই কবিতা পড়ে এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে একটু শক্ত মনে করেন, একটু সাহসী মনে করেন তাহলেই বিদ্রোহী কবিতা আজও জীবিত। কারণ এই কবিতা পড়ার জন্য নয়, এই কবিতা বাঁচার জন্য।

Disclaimer
We strive to provide accurate information, but we cannot guarantee that all details are always fully updated.

Affiliate Disclosure
This post may contain affiliate links. We may receive a commission if you make a purchase through these links, at no extra cost to you. For more details, please visit our Disclaimer Page.
আইটি বিতান
Emon

হাই! আমি ইমন, প্রযুক্তি, গ্যাজেট রিভিউ এবং নানা ধরণের বিষয় নিয়ে ব্লগ লিখি। পাঠকের জন্য সহজ, প্রাসঙ্গিক এবং তথ্যবহুল কনটেন্ট তৈরি করাই আমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। নতুন তথ্য শেয়ার করতে এবং পাঠকদের সাথে জ্ঞান ভাগাভাগি করতে পছন্দ করি।;

Next Post Previous Post
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন
comment url