মা দিবস: পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষকে ঘিরে বিশেষ এক দিন । মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো মা’। জন্মের পর থেকেই সন্তানের প্রতিটি অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এই ছোট্ট ডাকটি। আনন্দ, ভয়, কষ্ট কিংবা আশ্রয়ের মুহূর্ত সব জায়গায় মায়ের উপস্থিতি আলাদা এক অনুভূতি তৈরি করে। তাই মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন না হলেও বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর একটি দিন বিশেষভাবে মায়েদের সম্মান জানাতে পালন করা হয়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয় মা দিবস। এই দিনে সন্তানরা নানা উপায়ে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কেউ ফুল দেন, কেউ উপহার, আবার অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, কবিতা কিংবা ছোট বার্তার মাধ্যমে মায়ের প্রতি ভালোবাসা জানান। ঘরোয়া পরিবেশেই দিনটি সবচেয়ে বেশি উদযাপিত হয়।
প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক মা দিবসের যাত্রা
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মায়েদের সম্মান জানানোর ধারণা নতুন নয়। প্রাচীন গ্রিসে মাতৃরূপী দেবী সিবেলের আরাধনা এবং রোমান সভ্যতায় দেবী জুনোর পূজার সঙ্গে মাতৃত্ব উদযাপনের বিষয়টি যুক্ত ছিল। পরে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যেও মায়েদের জন্য আলাদা দিন পালনের প্রচলন তৈরি হয়। ইংল্যান্ডে ষোড়শ শতকে মাদারিং সানডে’ নামে একটি দিন পরিচিতি লাভ করে, যা লেন্টের সময় চতুর্থ রোববার পালন করা হতো।
তবে আধুনিক মা দিবসের পেছনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম আনা মারিয়া রিভস জারভিস। তার মা অ্যান ছিলেন নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা এক সমাজকর্মী। তিনি মাদারস ডে ওয়ার্ক ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একসময় তিনি মায়েদের সম্মান জানিয়ে একটি নির্দিষ্ট দিন ঘোষণার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। পরে ১৯০৫ সালে তার মৃত্যুর পর মেয়েই সেই উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নেন।
যেভাবে সরকারি স্বীকৃতি পেল মা দিবস
মায়ের স্মৃতিকে ধরে রাখতে আনা মারিয়া রিভস জারভিস প্রথমে তার সানডে স্কুলে মা দিবস পালন করেন। এরপর ধীরে ধীরে বিষয়টি আরও বড় আকার নিতে শুরু করে। ১৯০৮ সালের ১০ মে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার আন্দ্রেউজ মেথডিস্ট এপিসকোপাল চার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করা হয়।
এর কিছু সময় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবস চালুর পক্ষে বিভিন্ন উদ্যোগ ছিল। ১৮৭০ সালে জুলিয়া ওয়ার্ড হোই যুদ্ধের ভয়াবহতার প্রেক্ষাপটে শান্তির আহ্বান জানিয়ে মাদার্স ডে প্রক্লামেশন’ লেখেন। পরে সমাজকর্মী আনা রিভিজ জার্ভিস এবং তার মেয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পরিবারহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজের সঙ্গে এই দিবস উদযাপনও চালিয়ে যান।
ধীরে ধীরে আন্দোলনটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। কানাডা, মেক্সিকো, চীন, জাপান, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও মা দিবস পরিচিতি পেতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Woodrow Wilson মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয়ভাবে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই বিশ্বের বহু দেশে একই দিনে দিনটি পালিত হচ্ছে।
মা দিবসের মূল বিষয় শুধু শুভেচ্ছা নয়, বরং মায়ের ত্যাগ, স্নেহ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে স্মরণ করা। একজন মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক, সবচেয়ে বড় অভিভাবক এবং অনেক সময় সবচেয়ে কাছের বন্ধুও হয়ে ওঠেন। জীবনের প্রতিটি ধাপে সন্তানের পাশে থাকা মানুষটিকে সম্মান জানানোর উপলক্ষ হিসেবেই দিনটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলা সাহিত্যেও মায়ের মর্যাদা নিয়ে অসংখ্য লেখা রয়েছে। কবি Kazi Kader Newaz তার মা কবিতায় লিখেছিলেন, মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই, ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই। এই লাইন গুলো আজও অনেক মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিলে যায়।
বিশ্ব মা দিবসে তাই একটাই প্রত্যাশা পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুন, সুখে থাকুন এবং তাদের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা কখনও কমে না যাক।





