কেন বাড়ছে ফেসবুক হ্যাক এর ঘটনা
ডিজিটাল জীবনের বড় একটি অংশ এখন ফেসবুককে ঘিরে। ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসা, তথ্য আদান প্রদান কিংবা সামাজিক সম্পর্ক সব ক্ষেত্রেই এই প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বেড়েছে অনেক বেশি। তবে একই সঙ্গে বাড়ছে ফেসবুক হ্যাক হওয়ার অভিযোগও। অনেকেই হঠাৎ করে দেখছেন নিজের অ্যাকাউন্টে আর প্রবেশ করা যাচ্ছে না, আবার কারও আইডি ব্যবহার করে বন্ধুদের কাছে টাকা চাওয়া হচ্ছে বা অচেনা পোস্ট করা হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি সরাসরি ফেসবুকের নিরাপত্তা ভাঙার ঘটনা নয়। মূল সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য অন্যের হাতে চলে যায়। ইমেইল, পাসওয়ার্ড বা OTP সংগ্রহ করতে পারলেই প্রতারকরা সহজে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। অর্থাৎ ফেসবুক হ্যাকের বড় অংশই প্রযুক্তিগত জটিলতার চেয়ে ব্যবহারকারীর অসচেতনতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
ফিশিং লিংক এখন সবচেয়ে বড় ফাঁদ
বর্তমানে প্রতারকদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কৌশল হলো ফিশিং। এতে এমন একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়, যা দেখতে প্রায় ফেসবুকের অফিসিয়াল লগইন পেজের মতোই। ব্যবহারকারী সেখানে নিজের তথ্য প্রবেশ করালে সেই তথ্য সরাসরি চলে যায় প্রতারকদের কাছে। অনেক সময় মেসেঞ্জার বা ইমেইলের মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে বার্তা পাঠানো হয়। বলা হয়, অ্যাকাউন্টে সমস্যা হয়েছে, ভেরিফিকেশন দরকার, না হলে আইডি বন্ধ হয়ে যাবে। এমন বার্তায় থাকা লিংকে ক্লিক করেই অনেক ব্যবহারকারী বিপদে পড়েন।
প্রতারকরা শুধু অচেনা পরিচয় ব্যবহার করে না, পরিচিত মানুষের অ্যাকাউন্ট দিয়েও ফাঁদ তৈরি করে। একটি আইডির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখান থেকে বন্ধুদের কাছে সন্দেহজনক লিংক পাঠানো হয়। এই ভিডিওটি দেখুন বা আপনার ছবি এখানে রয়েছে এ ধরনের বার্তায় অনেকে বিশ্বাস করে ক্লিক করেন। এরপর অজান্তেই নিজেদের তথ্য অন্যের হাতে তুলে দেন।
দুর্বল পাসওয়ার্ডে বাড়ছে ঝুঁকি
ফেসবুক হ্যাকের আরেকটি বড় কারণ দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার। এখনও অনেক ব্যবহারকারী নিজের নাম, জন্মতারিখ কিংবা সহজ সংখ্যা দিয়ে পাসওয়ার্ড তৈরি করেন। এসব পাসওয়ার্ড অনুমান করা খুব কঠিন নয়। স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার দিয়েও অনেক সময় এগুলো বের করা সম্ভব হয়।
একই পাসওয়ার্ড একাধিক ওয়েবসাইটে ব্যবহার করাও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। কোনো একটি সাইটের তথ্য ফাঁস হলে সেই একই পাসওয়ার্ড দিয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও প্রবেশ করা যেতে পারে। এছাড়া সন্দেহজনক ব্রাউজার এক্সটেনশন, ভুয়া অ্যাপ কিংবা ক্ষতিকর সফটওয়্যার থেকেও তথ্য চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক malware ব্যবহারকারীর কিবোর্ডে টাইপ করা তথ্য পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারে। পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করেও অনেক সময় ঝুঁকি তৈরি হয়। অনিরাপদ নেটওয়ার্কে লগইন করলে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় সাইবার অপরাধীরা।
যেভাবে নিরাপদ রাখা সম্ভব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করলে ফেসবুক হ্যাকের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রথমেই প্রয়োজন শক্তিশালী এবং আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা। বড় হাতের ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্ন মিলিয়ে পাসওয়ার্ড তৈরি করলে নিরাপত্তা বাড়ে। Two Factor Authentication বা 2FA চালু রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে পাসওয়ার্ড জেনে গেলেও OTP ছাড়া অন্য কেউ অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারবে না। এ ছাড়া কোনো অচেনা লিংকে ক্লিক না করা, ভুয়া লগইন পেজ এড়িয়ে চলা এবং OTP কাউকে না দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিচিত কারও কাছ থেকেও অস্বাভাবিক বার্তা এলে আগে যাচাই করা উচিত। নিয়মিতভাবে ফেসবুকের Security and Login অপশন পরীক্ষা করাও জরুরি। কোন ডিভাইস থেকে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা হয়েছে তা সেখানে দেখা যায়। সন্দেহজনক কিছু নজরে এলে দ্রুত লগআউট করে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা উচিত।
সচেতনতার অভাবেই বাড়ছে ফেসবুক হ্যাক
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেসবুক হ্যাকের বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে অসতর্কতার কারণে। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ব্যবহারকারীর সচেতনতা। কারণ প্রতারকরা সরাসরি সিস্টেম ভাঙার চেয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেই তথ্য সংগ্রহে বেশি সফল হচ্ছে। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তাকে এখন আর সাধারণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে প্রতিটি ব্যবহারকারীকেই সতর্ক থাকতে হবে।
[ তথ্য: দৈনিক ইনকিলাব ]





