ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল: সৌদিতে তৈরি হলো বিদ্যুৎ ছাড়াই চলা নতুন কুলিং প্রযুক্তি, গরম অঞ্চলের জন্য বাড়তে পারে সম্ভাবনা । বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতলীকরণ প্রযুক্তির চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনারের বড় সমস্যা হলো উচ্চ বিদ্যুৎ খরচ এবং পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের King Abdullah University of Science and Technology এর গবেষকরা এমন একটি প্রযুক্তি সামনে এনেছেন, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই ঠান্ডা পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম। নতুন এই ব্যবস্থার নাম NESCOD। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে অফ-গ্রিড এলাকা বা অতিরিক্ত গরম অঞ্চলেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
গবেষকদের দাবি, প্রযুক্তিটি সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরে প্রয়োজনমতো কুলিং তৈরি করতে পারে। ফলে এটি শুধু বিকল্প কুলিং সমাধান নয়, বরং ভবিষ্যতের ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎনির্ভর কুলিং ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি হয় ঠান্ডা পরিবেশ
NESCOD এর মূল কার্যপ্রণালী তৈরি হয়েছে একটি এন্ডোথারমিক দ্রবণ প্রক্রিয়ার ওপর। এখানে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নামের একটি লবণ পানির সঙ্গে মেশানো হয়। এই বিক্রিয়ার সময় চারপাশের তাপ শোষিত হয়, ফলে তরলের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষাগারে এই সিস্টেম প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ১৯১ ওয়াট পর্যন্ত কুলিং ক্ষমতা দেখিয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে বিদ্যুৎ ছাড়াই শীতল পরিবেশ পাওয়া সম্ভব হয়। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ সুবিধা সীমিত, সেখানে এটি বাস্তবসম্মত ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল হিসেবে কাজ করতে পারে।
সূর্যের আলোতেই আবার প্রস্তুত হয় কুলিং সিস্টেম
প্রযুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পুনরায় ব্যবহারের ব্যবস্থা। গবেষকরা একটি থ্রিডি সোলার রিজেনারেটর তৈরি করেছেন, যা সূর্যের তাপ ব্যবহার করে দ্রবণে থাকা পানি বাষ্পে পরিণত করে। পানি আলাদা হয়ে গেলে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আবার স্ফটিক আকারে ফিরে আসে এবং পরবর্তী কুলিং চক্রের জন্য প্রস্তুত হয়। এর ফলে দিনের বেলায় সংগৃহীত সৌরশক্তি পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। এমনকি রাতের সময়েও এই কুলিং সুবিধা কাজে লাগানো যেতে পারে। শীতলীকরণ ও পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া আলাদা হওয়ায় সিস্টেমটি দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর রাখা সম্ভব হচ্ছে।
কম পানি ব্যবহারেও স্থিতিশীল পারফরম্যান্স
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, একাধিক চক্রের পরও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়নি। সরাসরি সূর্যালোকের মধ্যে এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ২.২ কেজি পানি বাষ্পে রূপান্তর করতে পারে। সেই সঙ্গে ৫ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তাপমাত্রা ধরে রাখার সক্ষমতাও দেখা গেছে।
এই তাপমাত্রা কোল্ড চেইন সংরক্ষণ এবং সীমিত পরিসরের কুলিংয়ের জন্য উপযোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উৎপন্ন হওয়া জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। গবেষকদের তথ্যমতে, পুনরুদ্ধার করা পানিতে অমেধ্যের পরিমাণ ১ পিপিএমেরও কম ছিল। পানির সংকট রয়েছে এমন শুষ্ক অঞ্চলে এই সুবিধা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
কম খরচে বড় পরিসরে ব্যবহারের সম্ভাবনা
NESCOD এ ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ইতোমধ্যেই সার শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে উপকরণটির সরবরাহ ও উৎপাদন অবকাঠামো আগে থেকেই বিদ্যমান। গবেষকদের মতে, এ কারণেই প্রযুক্তিটির ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে থ্রিডি সোলার রিজেনারেটরের নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ছোট জায়গাতেও বেশি বাষ্পীভবন সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে কুলিং ইউনিটপ্রতি উপকরণ খরচও কমে আসে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো দুর্বল বা ব্যয়বহুল এমন অঞ্চলগুলোতে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
[ তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া ]





