টেস্টটিউব বেবি কি? টেস্টটিউব বেবি কিভাবে নেওয়া হয় ?

প্রিয় পাঠক, আজকের ব্লগে টেস্টটিউব বেবি কি? টেস্টটিউব বেবি কিভাবে নেওয়া হয় ? সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো। টেস্টটিউব বেবি বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) হল একটি আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তি, যা প্রাকৃতিকভাবে সন্তান ধারণে অক্ষম দম্পতিদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

এই পদ্ধতিতে ল্যাবরেটরিতে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষেক ঘটানো হয় এবং পরে ভ্রূণকে মায়ের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। বিশ্বের প্রথম টেস্টটিউব বেবি, লুইস ব্রাউন, ১৯৭৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

টেস্টটিউব বেবি কি

টেস্টটিউব বেবি কী?

টেস্টটিউব বেবি হল একটি কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি, যেখানে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু বাইরে (ল্যাবে) নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করা হয় এবং পরে তা মায়ের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। এটি মূলত সেইসব দম্পতির জন্য ব্যবহৃত হয় যারা প্রাকৃতিকভাবে সন্তান ধারণে অক্ষম।

টেস্টটিউব বেবি পদ্ধতি:

টেস্টটিউব বেবি প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

১. মূল্যায়ন ও হরমোন থেরাপি

প্রথমে চিকিৎসক দম্পতির শারীরিক অবস্থা, বন্ধ্যাত্বের কারণ ইত্যাদি মূল্যায়ন করেন। মহিলাকে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়, যাতে ডিম্বাশয় থেকে একাধিক ডিম্বাণু উৎপাদন হয় (সাধারণত মাসিক চক্রে একটি ডিম্বাণু নির্গত হয়)।

২. ডিম্বাণু সংগ্রহ (Egg Retrieval)

হরমোন থেরাপির পর, আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ডিম্বাণু পরিপক্বতা পরীক্ষা করা হয়। একটি ছোট সার্জিক্যাল প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয় (সাধারণত অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হয়)।

৩. শুক্রাণু সংগ্রহ (Sperm Collection)

একই দিনে পুরুষের কাছ থেকে শুক্রাণু নেওয়া হয়। শুক্রাণুর গুণগত মান পরীক্ষা করে সেরা শুক্রাণু বাছাই করা হয়।

৪. নিষেক প্রক্রিয়া (Fertilization)

ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু একত্রিত করে নিষেক ঘটানো হয়। দুই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কনভেনশনাল IVF: ডিম্বাণু ও শুক্রাণু একসাথে রাখা হয়, যাতে স্বাভাবিকভাবে নিষেক ঘটে। ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন (ICSI): একটি শক্তিশালী শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুতে ইনজেক্ট করা হয় (শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতি কম থাকলে)।

৫. ভ্রূণ বিকাশ ও মনিটরিং

নিষিক্ত ডিম্বাণু ৩-৫ দিন ইনকিউবেটরে রাখা হয়, যাতে ভ্রূণ তৈরি হয়। ভ্রূণের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ভ্রূণ বাছাই করা হয়।

৬. ভ্রূণ স্থানান্তর (Embryo Transfer)

একটি ক্যাথেটারের মাধ্যমে ভ্রূণ মায়ের জরায়ুতে স্থাপন করা হয় (এটি ব্যথাহীন প্রক্রিয়া)। সাধারণত ১-২টি ভ্রূণ স্থানান্তর করা হয় (বহু গর্ভধারণ এড়ানোর জন্য)।

৭. প্রেগন্যান্সি টেস্ট

ভ্রূণ স্থানান্তরের ১০-১৪ দিন পর রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রেগন্যান্সি নিশ্চিত করা হয়।

কাদের জন্য টেস্টটিউব বেবি প্রয়োজন?

মহিলাদের ক্ষেত্রে: ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক থাকলে, ডিম্বাণুর গুণগত মান কম হলে, এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে বা বয়সজনিত কারণে গর্ভধারণে সমস্যা হলে। পুরুষদের ক্ষেত্রে: শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতি কম হলে বা শুক্রাণুর আকৃতি অস্বাভাবিক হলে। অন্যান্য কারণ: অনিয়ন্ত্রিত বন্ধ্যাত্ব বা জেনেটিক রোগ এড়ানোর জন্য।

সাফল্যের হার

টেস্টটিউব বেবির সাফল্য বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে, যেমন বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ক্লিনিকের মান। সাধারণত ৩৫ বছরের কম বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ৪০-৫০%। ৪০ বছরের বেশি বয়সে এই হার কমে ১৫-২০% হতে পারে।

সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ

সুবিধা: প্রাকৃতিকভাবে গর্ভধারণে ব্যর্থ দম্পতিরা সন্তান লাভ করতে পারেন। জেনেটিক সমস্যা স্ক্রিনিং করে সুস্থ ভ্রূণ নির্বাচন করা যায়। সারোগেসি বা দাতা ডিম্বাণু/শুক্রাণুর মাধ্যমে প্যারেন্টিং সম্ভব। চ্যালেঞ্জ: ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া (বাংলাদেশে ২-৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে)। হরমোনাল ইনজেকশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (মাথাব্যথা, মুড সুইং ইত্যাদি)। একাধিক গর্ভধারণের সম্ভাবনা। মানসিক চাপ ও উদ্বেগ।

মনে রাখার বিষয়

IVF একটি দীর্ঘ ও ধৈর্য্যের প্রক্রিয়া, একাধিক চক্র লাগতে পারে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। বাংলাদেশে অনেক ভালো IVF সেন্টার রয়েছে, যেমন – Apollo Hospitals, Birdem, প্রিমার IVF ইত্যাদি।

শেষকথা,

টেস্টটিউব বেবি প্রযুক্তি বন্ধ্যাত্বের শিকার দম্পতিদের জন্য একটি আশার আলো। যদিও এটি জটিল ও ব্যয়বহুল, তবে সঠিক চিকিৎসা ও সহযোগিতায় অনেকেই সফলভাবে সন্তান লাভ করছেন। যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ এই পদ্ধতি বিবেচনা করেন, তাহলে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং সমস্ত তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নিন।

Disclaimer

We do not guarantee that the information of this page is 100% accurate and up to date. Read More.